নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিনব কৌশলে প্রতারণা ও চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছিলেন এক ব্যক্তি। অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রামের পটিয়া থানা পুলিশ। শনিবার ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে অভিযান চালিয়ে তার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম রিয়াদ বিন সেলিম (৪০)। তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার পাইকপাড়া এলাকার মৃত মো. সেলিম উদ্দীনের ছেলে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছিলেন। তিনি নিজেকে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং বিভিন্ন ধরনের তদবির, চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, মামলা থেকে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ জমা পড়ার পর পটিয়া থানা পুলিশ তার ওপর নজরদারি শুরু করে। পরবর্তীতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার গভীর রাতে তার নিজ বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে বেশ কিছু সন্দেহজনক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তার নিজের ছবি সংবলিত একটি আইডি কার্ড যেখানে লেখা ছিল “CSF Chairperson’s Security Force” আইডি নম্বর ০১৩। এছাড়া একটি মেটাল ডিটেক্টর, একটি চার্জারসহ ওয়াকিটকি হ্যান্ডসেট, একটি কালো হাতল বিশিষ্ট সিগন্যাল লাইট, তার ছবি সংবলিত একটি মনিটরিং সেল কার্ড, একটি ওয়াকিটকি সদৃশ মোবাইল ফোন এবং একটি আইটেল বাটন মোবাইল সেট জব্দ করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রিয়াদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার দাবি করে ছবি পোস্ট করতেন। তিনি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার গল্প তৈরি করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। এসব ছবি ও পোস্টের মাধ্যমে তিনি মানুষের মধ্যে নিজের সম্পর্কে একটি ভুয়া প্রভাবশালী পরিচয় তৈরি করতেন।তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এসব ছবির অনেকগুলোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল শাখার নামে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তদবিরের নামে টাকা আদায় করতেন। সরকারি অফিসে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন এবং অর্থ আদায় করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ জানায়, কামরুল হাসান নামে এক গ্রেপ্তার আসামি জেলে থাকার সময় তাকে জামিনে মুক্ত করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রিয়াদ তার স্ত্রীর কাছ থেকে দুই লাখ পনেরো হাজার তিনশ টাকা হাতিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরও জামিনের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার বিষয়টি বুঝতে পারে এবং পরে থানায় অভিযোগ দায়ের করে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।
গ্রেপ্তারের পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো বিশ্লেষণ করে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ট্যাক্স ইন্সপেক্টর, কন্ট্রোল রুম কর্মকর্তা, সার্ভার ইনচার্জসহ বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি চাকরি নিশ্চিত করার নামে অগ্রিম টাকা নিতেন এবং পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতেন।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, রিয়াদ ভুয়া পার্সেল ডেলিভারির তথ্য ব্যবহার করেও প্রতারণা করতেন। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিদেশ থেকে পার্সেল এসেছে বলে জানিয়ে তিনি কাস্টমস বা ডেলিভারি চার্জের নাম করে টাকা আদায় করতেন। পরে দেখা যেত ওই পার্সেলের কোনো অস্তিত্বই নেই। এভাবেই তিনি বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং মাদক সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব মামলার পাশাপাশি নতুন করে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে।
পটিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার রিয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন এমন আরও ভুক্তভোগীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ বলছে, তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আরও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার চেষ্টা করছে। এ ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিচয়ে টাকা দাবি করে, তাহলে যাচাই ছাড়া কাউকে অর্থ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।





